ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬,  ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
অঙ্গ পাচার চক্রের হাত থেকে ফিরল লোহাগাড়ার রায়হান ডিএমপির ৩ সহকারী পুলিশ কমিশনারকে নতুন পদে বদলি মধ্যপ্রাচ্যে উত্তাপ: বিশ্ববাজারে তেলের দাম ছাড়াল ১০৭ ডলার হরমুজে নতুন নৌপথ: ওমানের আঞ্চলিক বৈঠক স্থগিত দেশে ফিরে ইতালিতে হামলার বিরুদ্ধে মুখ খুললেন অভিনেত্রী বাঁধন ব্রিকসে বিশ্বনেতাদের দেওয়া হলো নিরামিষ খাবার: বিজেপি-কংগ্রেস তুমুল বিতর্ক সারাদেশে ঘরে ঘরে জ্বর: ডেঙ্গু ও হামের সঙ্গে বাড়ছে টাইফয়েড ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ হলেই কি থামবে মধ্যপ্রাচ্যের ইরান যুদ্ধ? ‘ট্রফি চোর’ অপবাদ মাথায় নিয়ে শান্ত মেজাজে মাঠ ছাড়লেন নাকভি ২৩ বছরের খরা কাটল না আমেরিকার, ইউএস ওপেনের ট্রফি জভেরেভের হাতে

১৪২% বেতন বৃদ্ধির পরও দুর্নীতি বন্ধ না হলে এই বৃদ্ধির মূল্য কোথায়?


  • আপলোড সময় : বৃহস্পতিবার ০৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সময় : ১:৩৬ পিএম

২০২৬ সালের নবম জাতীয় পে স্কেলে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন সর্বনিম্ন গ্রেডে ১৪২ শতাংশ থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ পর্যায়ে ১০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়েছে। একই সঙ্গে অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারীদের পেনশনে যে অর্থ বৃদ্ধি করা হয়েছে, তা ২০২৬ সালের জুলাই মাস থেকেই কার্যকর হতে যাচ্ছে। দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক সংকট এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) চরম মতবিরোধ ও শর্তের পরও সরকার এক ধরনের ঝুঁকি নিয়েই সরকারি কর্মচারীদের সন্তুষ্ট করতে এই নতুন বেতন কাঠামো ঘোষণা করেছে। তবে স্মরণ রাখা প্রয়োজন, সরকারি কর্মচারীদের এই বর্ধিত বেতন-ভাতা ও সুবিধার অর্থ পরিশোধ করা হবে এ দেশের খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের কষ্টার্জিত ট্যাক্স বা করের টাকায়।


বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে, বিশেষ করে সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত সংস্থাগুলোতে দুর্নীতির বিস্তার উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী এখন দুর্নীতি ও ঘুষকে প্রধান অর্থ উপার্জনের হাতিয়ার হিসেবে বেছে নিয়েছেন। তবে নবম পে স্কেলে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বেতন বাড়ার পর তাদের কাছে এখন আর "কম বেতনে সংসার চলে না" বা "নুন আনতে পান্তা ফুরায়"—এই ধরনের অজুহাত দেওয়ার আর কোনো নৈতিক সুযোগ থাকল না।
নিচে দেশের সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতায় সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত ও হয়রানির শিকার হতে হওয়া প্রধান ২০টি সরকারি প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম ও দুর্নীতির চিত্র বিস্তারিত তুলে ধরা হলো:

বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত ২০টি প্রতিষ্ঠানের চিত্র

১. বাংলাদেশ পাসপোর্ট অফিস: নতুন পাসপোর্ট তৈরি, ই-পাসপোর্ট নবায়ন কিংবা জরুরি পাসপোর্ট পেতে গিয়ে সাধারণ মানুষ মারাত্মক ভোগান্তিতে পড়েন। পাসপোর্ট অফিসে সক্রিয় দালাল চক্র ও অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশে পুলিশ ভেরিফিকেশন থেকে শুরু করে ফরম জমা ও বায়োমেট্রিক প্রদানে পদে পদে ঘুষ না দিলে ফাইল আটকে রাখা হয়।


২. বাংলাদেশ সাব-রেজিস্ট্রার অফিস: জমি কেনাবেচা ও রেজিস্ট্রি প্রক্রিয়ায় সরকারি নির্ধারিত ফি-এর বাইরে মোটা অঙ্কের অবৈধ লেনদেন এখানে একপ্রকার নিয়মেই পরিণত হয়েছে। দলিল পাস, খতিয়ান যাচাই ও জমি হস্তান্তরের প্রতিটি ধাপে সাধারণ মানুষকে অতিরিক্ত অর্থ গুনতে হয় এবং চরম হয়রানির শিকার হতে হয়।


৩. বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ): অপেশাদার ও পেশাদার ড্রাইভিং লাইসেন্স গ্রহণ, যানবাহনের ফিটনেস সনদ সংগ্রহ এবং রুট পারমিট অনুমোদনের ক্ষেত্রে শক্ত সিন্ডিকেট বিদ্যমান। ঘুষের বিনিময়ে ভুয়া ফিটনেস সনদ দেওয়া এবং লাইসেন্স পরীক্ষায় অলিখিত সুবিধার অভিযোগ এখানে নিত্যদিনের ঘটনা।


৪. বিচার বিভাগ (অধস্তন আদালতসমূহ): বিচারপ্রার্থী সাধারণ মানুষ আদালতের পিয়ন, পেশকার ও একশ্রেণীর মধ্যস্বত্বভোগীদের মাধ্যমে নিয়মিত আর্থিক লেনদেনে বাধ্য হন। মামলার নতুন তারিখ নির্ধারণ, জামিন আবেদন, রায়ের কপি সংগ্রহসহ ছোটখাটো প্রতিটি ধাপে অনৈতিক অর্থদাবি করার অভিযোগ রয়েছে।


৫. রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক): গৃহসংস্থান পরিকল্পনা পাস, বহুতল ভবনের নকশা অনুমোদন, প্লট বরাদ্দ এবং ভূমির মালিকানা পরিবর্তনের নথিপত্র অনুমোদনে কোটি কোটি টাকার গোপন বাণিজ্যের অভিযোগ ওঠে। এখানে ঘুষ ছাড়া নকশা পাস করা সাধারণ নাগরিকের জন্য প্রায় অসম্ভব।

নকশাবিহীন ভবনে রাজউকের দ্বিচারিতা ও অর্থ বাণিজ্যের অভিযোগ: রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) নজরদারির অভাবে ঢাকা শহরে নকশাবিহীন অসংখ্য ভবন গড়ে উঠেছে। এসব অবৈধ ইমারত উচ্ছেদে রাজউক কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার বদলে অনিয়মে জড়িয়ে পড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। মোটা অঙ্কের অবৈধ সুবিধার বিনিময়ে রাজউকের আইন বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট জোনাল অফিসের কিছু অসাধু কর্মকর্তা নকশাবিহীন ভবন মালিকদের ছাড় দিয়ে নীরব ভূমিকা পালন করছেন। অন্যদিকে যেসব বাড়ির মালিক কাঙ্ক্ষিত অর্থ দিতে ব্যর্থ হন, কেবল তাদের ভবনগুলোতেই উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়। উচ্ছেদের নামে এই পক্ষপাতমূলক আচরণ ও অর্থ বাণিজ্যের কারণে রাজধানীজুড়ে পরিকল্পিত নগরায়ণ চরম হুমকির মুখে পড়েছে।


৬. বাংলাদেশ পুলিশ: সাধারণ মানুষের সুরক্ষার প্রতীক হলেও থানার মামলা (জিডি বা এফআইআর) দায়ের, নিরপেক্ষ তদন্ত পরিচালনা, অভিযোগপত্র (চার্জশিট) গঠন এবং আসামির নাম বাদ দেওয়া বা অন্তর্ভুক্ত করার ক্ষেত্রে ব্যাপক উৎকোচ গ্রহণের নজির রয়েছে।


৭. বাংলাদেশ ভূমি অফিস (এসিল্যান্ড ও তহসিল অফিস): জমির নামজারি (মিউটেশন), খাজনা প্রদান, দাগ-খতিয়ান খারিজ এবং রেকর্ডের ভুল সংশোধনে নাগরিকরা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েন। টাকা না দিলে মাসের পর মাস আবেদন ঝুলিয়ে রাখা হয়।


৮. গণপূর্ত অধিদপ্তর (পিডব্লিউডি): সরকারি স্থাপনা নির্মাণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কার কাজের দরপত্র (টেন্ডার) আহ্বানে ব্যাপক অনিয়ম ঘটে। কাজ পাইয়ে দেওয়ার বিনিময়ে নির্দিষ্ট পার্সেন্টেজ বা কমিশন বাণিজ্য এবং ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগসাজশে কাজের নিম্নমান নিশ্চিত করার অভিযোগ পুরোনো।


৯. স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও সরকারি হাসপাতালসমূহ: হাসপাতালে সাধারণ রোগীদের জন্য বরাদ্দকৃত বিনামূল্যে ওষুধ কালোবাজারিতে বিক্রি, আইসিইউ ও সাধারণ বেড পেতে দরকষাকষি, ডায়াগনস্টিক টেস্টে কমিশন এবং স্বাস্থ্য খাতে কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ ও বদলি বাণিজ্যের সিন্ডিকেট অত্যন্ত শক্তিশালী।


১০. বাংলাদেশ রেলওয়ে: ট্রেনের টিকিট কালোবাজারি, ট্রেনের কোচ ও ইঞ্জিন ক্রয়, নতুন লাইন নির্মাণ প্রকল্পের কেনাকাটা এবং জনবল নিয়োগে অনিয়মের মাধ্যমে শত শত কোটি টাকার দুর্নীতি হয়, যার ফলে লোকসানের বৃত্ত থেকে বের হতে পারছে না প্রতিষ্ঠানটি।


১১. বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট কর্পোরেশন (বিআরটিসি): নতুন বাস ও স্পেয়ার পার্টস ক্রয়, লাভজনক রুট বরাদ্দ প্রদান, বাস লিজ দেওয়া এবং গাড়িচালক ও মেকানিক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে।


১২. জেলা প্রশাসকের কার্যালয় (ডিসি অফিস): আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স, বিভিন্ন ধরনের নাগরিাক সনদ, অনুমতিপত্র গ্রহণ, উন্নয়নমূলক প্রকল্পের অনুমোদন এবং জরুরি সরকারি ত্রাণ ও সহায়তা বিতরণে জেলা পর্যায়ের প্রশাসনিক কার্যালয়ে অনিয়মের নানা অভিযোগ পাওয়া যায়।


১৩. বাংলাদেশ সচিবালয়: জাতীয় নীতি নির্ধারণী এই কেন্দ্রে ফাইল আটকে রেখে নির্দিষ্ট সুবিধা আদায়, কাঙ্ক্ষিত দপ্তরে বদলি ও পদোন্নতির জন্য জোর লবিং এবং বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের ঠিকাদারিতে সুপারিশ বাণিজ্যের মতো অপ্রকাশ্য অনিয়ম ঘটে থাকে।


১৪. জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর): কাস্টমস হাউস, বন্দর ও আয়কর অফিসগুলোতে ব্যবসায়ীদের শুল্ক ফাঁকির সুযোগ করে দিয়ে মোটা অঙ্কের ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এর ফলে সরকার প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হয়।


১৫. শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি ও প্রাথমিক শিক্ষা): বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নতুন শিক্ষক নিয়োগ, এমপিওভুক্তকরণ, শিক্ষকদের জ্যেষ্ঠতা প্রদান এবং পছন্দের স্কুলে বদলি ও পদোন্নতি পেতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উৎকোচ প্রদান করতে হয়।


১৬. সিটি কর্পোরেশনসমূহ: ট্রেড লাইসেন্স ইস্যু ও নবায়ন, ভবনের হোল্ডিং ট্যাক্স নির্ধারণ, সড়ক সংস্কার ও ড্রেনেজ নির্মাণের দরপত্র এবং দোকান বরাদ্দে বিপুল পরিমাণ আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ উঠে আসে।


১৭. মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়: ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদ তৈরি ও তালিকাভুক্তকরণ, সনদ সংশোধন, ভাতা প্রদান প্রক্রিয়া এবং কল্যাণ ট্রাস্টের সম্পত্তি বণ্টন ও বাণিজ্যিক ব্যবহারে স্বজনপ্রীতি ও আর্থিক অনিয়মের সত্যতা পাওয়া যায়।

উল্লেখ্য, স্বাধীনতার মূল চেতনা ও মর্যাদাকে অক্ষুণ্ণ রাখার উদ্দেশ্যে ২০০১ সালে গঠিত হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং এর সহযোগী সংস্থা বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট। অথচ অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলেও সত্য, প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এই প্রতিষ্ঠান দুটি প্রকৃত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণ সাধনের চেয়ে 'ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা' তৈরির কারখানা হিসেবে বেশি সমালোচিত ও বিতর্কিত হয়েছে। দলীয় স্বার্থ ও রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে যখন যে সরকার ক্ষমতায় এসেছে, তারা নিজেদের পছন্দের লোকজনকে মুক্তিযোদ্ধা বানানোর রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় মেতে উঠেছে। রাষ্ট্রীয় সনদ, ভাতা এবং সরকারি চাকরির সুবর্ণ সুযোগ হাসিলের জন্য ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের এই বিশাল বহর তৈরি করা হয়েছে, যা প্রকৃত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের ত্যাগের প্রতি এক চরম অবমাননা।

মন্ত্রণালয় ও কল্যাণ ট্রাস্টের এই অনিয়মের সবচেয়ে ভয়াবহ ও সুস্পষ্ট দৃষ্টান্ত দেখা যায় স্বায়ত্তশাসিত ও সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে ভুয়া সনদে নিয়োগপ্রাপ্তদের ক্ষেত্রে। উদাহরণস্বরূপ, মুজিবনগর সরকারের কর্মচারী পরিচয় দিয়ে ভুয়া সনদের মাধ্যমে সাব-রেজিস্ট্রার পদে নিয়োগ পাওয়া ১৯০ জন ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার নাম উল্লেখ করা যায়। আমি দীর্ঘদিন ধরে এই অনিয়ম ও ভুয়া সনদে নিয়োগপ্রাপ্তদের বিরুদ্ধে তথ্য-প্রমাণ সহকারে লেখনী চালিয়ে আসছি। অথচ চরম দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, গণমাধ্যমে এত লেখালেখি ও তথ্য প্রকাশের পরও কোনো প্রশাসনিক বা দৃশ্যমান আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি।

অভিযোগ রয়েছে, মুজিবনগর সরকারের কর্মচারী পরিচয়ে ভুয়া সনদ হাতিয়ে নেওয়া এই সাব-রেজিস্ট্রাররা সারা দেশের ভূমি অফিস ও রেজিস্ট্রেশন বিভাগে বহাল তবিয়তে চাকরি করে যাচ্ছেন এবং অনৈতিক পন্থায় শত শত কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ উপার্জন করেছেন। তাদের এই অপকর্মের বিরুদ্ধে মহামান্য হাইকোর্টে রিট আবেদন করা হলেও, সেই রিটের বিপরীতে আইনি লড়াই চালি়য়ে স্থগিতাদেশ (Stay Order) ভ্যাকেন্ট (Vacant) করার বা আইনগত নিষ্পত্তি করার জন্য মন্ত্রণালয় কোনো জোরালো উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। বিগত সরকারগুলোর পাশাপাশি বর্তমান সরকারের আমলেও এক "অদৃশ্য কারণে" এই ভুয়া সাব-রেজিস্ট্রারদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকা হচ্ছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

বর্তমান মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় ও এর দায়িত্বপ্রাপ্তরা দৃশ্যত এমন কোনো উল্লেখযোগ্য কার্যক্রম পরিচালনা করছেন না, যা দেখে মনে হতে পারে তারা ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা থেকে বাদ দিতে আন্তরিক। ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের চিহ্নিত করে চূড়ান্ত তালিকা থেকে তাদের নাম ছাঁটাই করার ক্ষেত্রে কোনো বাস্তবসম্মত বা কার্যকর ভূমিকা পালন করতে দেখা যাচ্ছে না।

মুক্তিযুদ্ধ আমাদের জাতীয় ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। বীর মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে পাওয়া এই স্বাধীন দেশে যদি ভূয়া সনদের ওপর ভর করে শত শত কোটি টাকার দুর্নীতির সাম্রাজ্য গড়ে ওঠে, তবে তা হবে সমগ্র জাতির জন্য লজ্জাজনক।

মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতি ও কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ

বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট ও এর আওতাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে চরম দুর্নীতি ও অনিয়ম চলছে। ট্রাস্টের একমাত্র লাভজনক প্রতিষ্ঠান ‘পূর্ণিমা ফিলিং স্টেশন’-এ দীর্ঘদিন দায়িত্বে থাকা যুগ্মপরিচালক আবুল কাশেম চৌধুরী ও পাম্প অপারেটর বোরহান বেপারীর বিরুদ্ধে প্রতি ১০ লিটার তেলে ১ লিটার কম দিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। লিখিত অভিযোগ সত্ত্বেও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ রহস্যজনক নীরবতা বজায় রেখেছে।

অন্যদিকে সাবেক এমডি ইফতেখারুল ইসলাম খান ও বর্তমান যুগ্মপরিচালক (প্রশাসন) ফয়েজ আহমেদ খান ট্রাস্টের ১০টি প্রতিষ্ঠান নামমাত্র মূল্যে ইজারা দিয়ে বিপুল অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। পাশাপাশি গুলিস্তান কমপ্লেক্সে অসমান চুক্তি করে ডেভেলপার কোম্পানিকে ট্রাস্টের স্বত্ব হস্তান্তরের বিনিময়ে মোটা অঙ্কের সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ উঠে এসেছে সাবেক মন্ত্রী মোজাম্মেল হক, সাবেক সংসদীয় কমিটির সভাপতি শাজাহান খান ও সাবেক এমডি ইফতেখারুল ইসলামের বিরুদ্ধে।

আমাদের দাবি ও করণীয়:

১. মুজিবনগর সরকারের কর্মচারী পরিচয়ে ভুয়া সনদে নিয়োগপ্রাপ্তদের ফাইল পুনরায় নিরপেক্ষ তদন্তের আওতায় আনতে হবে।

২. হাইকোর্টে ঝুলে থাকা রিট আবেদনগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে অভিজ্ঞ আইনি দল গঠন করে অবিলম্বে কার্যকরি ব্যবস্থা নিতে হবে।

৩. ভুয়া সনদ ব্যবহার করে যারা এতদিন সরকারি সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেছেন এবং কোটি কোটি টাকা অবৈধভাবে উপার্জন করেছেন, তাদের অর্জিত অবৈধ সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে রাষ্ট্রীয় কোষাঘারে জমা করতে হবে।

৪. রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে একটি নিরপেক্ষ উচ্চপর্যায়ের কমিশন গঠন করে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের নির্ভুল তালিকা চূড়ান্ত করতে হবে এবং জালিয়াতির সাথে যুক্ত কর্মকর্তাদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে হবে।

দেশের মানুষের কষ্টার্জিত ট্যাক্সের টাকা ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের পেছনে অপচয় হতে দেওয়া যায় না। ইতিহাস ও আগামী প্রজন্মের কাছে দায়বদ্ধ থাকতে হলে এই খাতে অবিলম্বে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি।


১৮. বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স: উড়োজাহাজ লিজ গ্রহণ, যন্ত্রাংশ ও গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সরঞ্জাম কেনাকাটা, কার্গো পরিবহন, বিমানের ওভারসিজ টিকিট বুকিং সিন্ডিকেট এবং অভ্যন্তরীণ কর্মকর্তা নিয়োগে দুর্নীতির ইতিহাস দীর্ঘ।


১৯. রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকসমূহ: ভুয়া কাগজপত্র ও অসত্য জামানত দেখিয়ে হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণ অনুমোদন, এলসি খোলার ক্ষেত্রে কমিশন গ্রহণ এবং কর্মকর্তা পদোন্নতিতে অনৈতিক সুবিধার মাধ্যমে আর্থিক খাতকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলা হয়েছে।


২০. দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক): স্বয়ং দুর্নীতি প্রতিরোধের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত এই সংস্থায় কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে মূল আসামিদের বাঁচিয়ে দেওয়া, অনুসন্ধান ধামাচাপা দেওয়া এবং নোটিশ পাঠিয়ে ব্যবসায়ীদের ভয়ভীতি দেখিয়ে ব্যক্তিগত সুবিধা হাসিলের অভিযোগ রয়েছে।


এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, সব কর্মকর্তা-কর্মচারী দুর্নীতিগ্রস্ত নন। অনেক সৎ, নিষ্ঠাবান ও দেশপ্রেমিক কর্মকর্তা এখনও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। তবে অসাধু ব্যক্তিদের আধিপত্যের কারণে পুরো প্রশাসনিক ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে।

দুর্নীতি দমন কমিশনকে স্বাধীন ও ঢেলে সাজানোর প্রস্তাবনা

সরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রকাশ্যে চলা এই ঘুষ বাণিজ্য ও দুর্নীতির লাগাম টানতে রাষ্ট্রীয়ভাবে দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) সম্পূর্ণ স্বাধীন, নিষ্পক্ষ ও শক্তিশালী ক্ষমতা প্রদান করা আবশ্যক। এ লক্ষ্যে কিছু জরুরি প্রস্তাবনা বাস্তবায়ন করা যেতে পারে:
১. জনবল শক্তিশালীকরণ ও বিষবৃক্তকরণ: দুদকের কার্যকরী সক্ষমতা বাড়াতে প্রয়োজনীয় আধুনিক জনবল বাড়াতে হবে। তবে সংস্থার অভ্যন্তরে যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারী নিজেরা দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত, তাদের চিহ্নিত করে অবিলম্বে চাকরি থেকে বরখাস্ত করতে হবে এবং নতুন, সৎ ও তরুণদের সুযোগ দিতে হবে।


২. অনুসন্ধান শুরুতেই বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা: কোনো সরকারি কর্মকর্তা বা ব্যক্তির বিরুদ্ধে দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধান শুরু হওয়ামাত্রই তার বিদেশযাত্রার ওপর আইনি নিষেধাজ্ঞা জারি করতে হবে, যাতে তারা অর্থ পাচার করে বা দেশ ছেড়ে পালিয়ে বিচার এড়াতে না পারে।


৩. দ্রুত বিচার ও অবৈধ সম্পদ বাজেয়াপ্তকরণ: বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের মাধ্যমে ৩ মাসের মধ্যে দুর্নীতি মামলার বিচারপ্রক্রিয়া শেষ করার আইনি বাধ্যবাধকতা তৈরি করতে হবে। বহু বছর ধরে মামলা ঝুলিয়ে রাখার প্রথা বন্ধ করতে হবে। যারা দুর্নীতির টাকায় বিদেশে বেগমপাড়া বা লাক্সারি জীবনযাপন করছেন, আন্তর্জাতিক সংস্থার সহায়তায় তাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে দেশে ফেরত আনতে হবে।


৪. প্রতিটি অফিসে দুর্নীতিবাজের তালিকা প্রণয়ন: প্রতিটি সরকারি দপ্তর ও অফিসে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, নিরপেক্ষ সৎ সাংবাদিক এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি পর্যবেক্ষণ সেল গঠন করে সম্ভাব্য দুর্নীতিবাজদের তালিকা তৈরি ও প্রশাসনিক নজরদারিতে রাখতে হবে।


৫. রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ সম্পূর্ণরূপে বন্ধ: দুদক যাতে কোনো রাজনৈতিক দল বা প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত না হয় এবং সম্পূর্ণ ভয় ও অনুগ্রহের ঊর্ধ্বে উঠে স্বাধীনভাবে তদন্ত চালাতে পারে, তা সংবিধিবদ্ধভাবে নিশ্চিত করতে হবে।

সরকারি কর্মচারীদের প্রতি বার্তা

মনে রাখতে হবে, পে স্কেলে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যে বেতন ১৪২ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে এবং পেনশনে যে আর্থিক বৃদ্ধি আনা হয়েছে, তার পুরোটাই এ দেশের কৃষক, শ্রমিক ও মেহনতি মানুষের করের টাকা। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সরকারি কর্মচারীরা জনগণের সেবক বা সার্ভেন্ট। অথচ আমাদের দেশে চিত্রটি উল্টো—যেখানে দেশের মালিক তথা সাধারণ জনগণ কর্মচারীদের স্যার ডাকতে বাধ্য হয় এবং ঘুষ না দিলে ফাইলের কাগজ নড়ে না। এই মানসিকতা ও সংস্কৃতি থেকে অবিলম্বে বেরিয়ে আসতে হবে। জনগণকে প্রকৃত মালিকের সম্মান দিয়ে স্বতঃস্ফূর্ত সেবা প্রদান করাই প্রতিটি সরকারি কর্মচারীর প্রধান দায়িত্ব।

বাংলাদেশ সরকারের বার্ষিক বাজেটে যে পরিমাণ অর্থের সংস্থান প্রয়োজন হয়, ক্ষেত্রবিশেষে তার একটি বিশাল অংশ প্রতি বছর দুর্নীতিবাজদের মাধ্যমে অপচয় ও বিদেশে পাচার হয়ে যায়। তাই বেতন স্কেল বৃদ্ধির পর এখন দুর্নীতি পুরোপুরি নির্মূল করাই বর্তমান সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। আসুন, কর্মচারীদের বেতন ১৪২% বৃদ্ধির এই ঐতিহাসিক সুযোগকে কাজে লাগিয়ে আমরা সবাই মিলে একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তুলি।

লেখক:
আব্দুল কাইয়ুম খান
পরিচালক, দুর্নীতি বিরোধী অভিযান

 


এ সম্পর্কিত আরো খবর